নারীর ইতিহাস

নারীর ইতিহাস হল এমন এক ধরনের শিক্ষা যেখানে নারীরা ইতিহাসে কি ভূমিকা পালন করেছেন এবং কোন উপায়ে তা করেছেন তা বিবৃত হয়। লিপিবদ্ধ ইতিহাসে নারীর অধিকার আদায়ের ইতিহাস, একক এবং দলগতভাবে ইতিহাসে নারীদের গুরুত্ব পর্যালোচনা, এবং তাদের উপর ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর প্রভাব এই শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। নারীর ইতিহাস শিক্ষায় দেখা যায় অনেক রেকর্ড পাওয়া যায় না বা তাদের অবদান এবং তাদের উপর ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর প্রভাব উপেক্ষা করা হয়। ফলে নারীর ইতিহাসে অনেক ক্ষেত্রেই সংশোধনের প্রয়োজনীতা দেখা যায়।

পাণ্ডিত্যের প্রায় সবগুলো কেন্দ্রই যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনে, যেখানে নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গ সমর্থনকারী ইতিহাসবেত্তারা সামাজিক ইতিহাসের নতুন প্রগতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। নারী স্বাধীনতায় সক্রিয় কর্মীরা নারীদের অভিজ্ঞতালব্ধ অসমতা ও নিপীড়ন নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে থাকেন। তারা মনে করেন তাদের পূর্বনারীপ্রজন্মের জীবন থেকে শিক্ষা নেয়াটা বাধ্যতামূলক। ইতিহাস মূলত লেখা হয়েছে পুরুষের হাতে এমনকি গণপরিবেশের যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি এবং প্রশাসননীতিতেও পুরুষের সক্রিয়তার গল্পই উঠে এসেছে।

অঞ্চলসমূহ

আফ্রিকা

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নারীর ইতিহাস নিয়ে কয়েকটি ছোট-খাট গবেষণা হয়েছে।[১][২][৩] কয়েকটি জরিপে উপ-সাহারা আফ্রিকার নারীদের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।[৪][৫]

এছাড়া কয়েকটি দেশ ও অঞ্চল, যেমন নাইজেরিয়া[৬] ও লেসথোর[৭] নারীর ইতিহাসের উপর বেশ কয়েকটি গবেষণা হয়েছে।

পণ্ডিতগণ অভিনব সূত্রের ভিত্তিতে আফ্রিকার নারীদের ইতিহাস নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছেন, যেমন মালাউয়ির গান, সকটোর বুনন কৌশল, এবং ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান।[৮]

আমেরিকা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

নারীরা এককভাবে নারীর ইতিহাস রচনা ছাড়াও নারীর ইতিহাস রচনায় প্রথম দলবদ্ধ প্রচেষ্টা ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউনাইটেড ডটার্স অফ দ্য কনফেডারেসি (ইউডিসি) থেকে। এসময়ে যখন পুরুষ ইতিহাসবেত্তাগণ যুদ্ধ ও সেনাপতিদের ইতিহাস রচনায় ব্যস্ত, ইউডিসি প্রচেষ্টায় নারীদের গল্প সংগ্রহ করে। নারীরা নারীবাদী কার্যক্রম, কর্মদক্ষতা ও নেতৃত্বের উপর জোর দেন। তাদের প্রতিবেদনে উঠে আসে যখন পুরুষগণ যুদ্ধে চলে গেলে নারীরা দায়িত্ব গ্রহণ করত, খাদ্য অন্বেষণ করত, ফ্যাক্টরিতে তৈরি পোশাক অপর্যাপ্ত হলে চরকা দিয়ে পোশাক তৈরি, এবং কৃষি জমি ও উদ্যানের কাজ পরিচালনা করত। তারা পুরুষরা না থাকার ফলে বিপদের সম্মুখীন হত।[৯]

কানাডা

ইউরোপ

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমন আইনে নারীদের সম-অধিকার রক্ষিত হয়েছে। নারীরা যুগ যুগ ধরে গৃহস্থালীর কাজ, সন্তান জন্ম ও লালন পালন, সেবিকা, মা, স্ত্রী, প্রতিবেশী, বন্ধু ও শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছে। যুদ্ধকালীন সময়ে নারীদের দিয়ে শ্রম বাজারে এমন কাজও করানো হয়েছে যা পুরুষদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তারা তাদের চাকরী হারায় এবং তাদের পুনরায় গৃহস্থালী ও সেবামূলক কাজে নিয়োজিত হয়।[১০][১১][১২]

ফ্রান্স

ফরাসি ইতিহাসবেত্তাগণ এক ধরনের অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছে। ফ্রান্সে নারী ও জেন্ডার শিক্ষা বিষয়ক প্রোগ্রাম বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন আলাদা বিভাগ না থাকলেও নারী ও জেন্ডার ইতিহাস নিয়ে বিশদ গবেষণা হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য একাডেমিকদের সামাজিক ইতিহাস ভিত্তিক গবেষণায় গৃহীত কৌশলও নারীর ইতিহাসের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। নারী ও জেন্ডার ইতিহাস নিয়ে বেশি মাত্রার গবেষণা ও প্রকাশনার কারণ হিসেবে ফরাসি সামজের উচ্চ আগ্রহকে দেখানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে ফ্রান্সে জেন্ডার ইতিহাস বিষয়ের গবেষণার ক্ষেত্রে বৈষম্যের হার পরিবর্তিত হচ্ছে এবং অনেক ফরাসি পণ্ডিতগণ ইউরোপের বাইরেও নিয়োগ খুঁজছেন।[১৩]

রাশিয়া

রাশিয়ায় নারীর ইতিহাস রচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে জারদের যুগ থেকে, এবং আলেক্সান্দ্‌র পুশকিন এর লেখার মাধ্যমে তা সকলের নজরে আসে। সোভিয়েত যুগে সমতার আদর্শে নারীবাদের সূচনা হয়, কিন্তু এর প্রয়োগে এবং গৃহের কার্যাবলিতে পুরুষদের কর্তৃত্ব প্রদর্শন করতে দেখা যেত।[১৪][১৫]

১৯৯০ এর দশকে নতুন সাপ্তাহিকী, বিশেষ করে কাসাসওডিসাস: ডায়লগ উইথ টাইম, অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ" নারীর ইতিহাস এবং সাম্পতিককালে জেন্ডার ইতিহাস উস্কে দেয়। জেন্ডার মতবাদের বিকাশের ফলে নারীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান থেকে লিঙ্গ পার্থক্য ধারণায় নজর চলে আসে। জেন্ডার মতবাদের ইতিহাস লেখনীকে আরো গভীর বিতর্কের দিকে নিয়ে যায় এবং ব্যক্তিগত, স্থানীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে একত্রিত করে সাধারন একটি ইতিহাস রচনায় উদ্বুদ্ধ করে ।[১৬][১৭]

এশিয়া

এশিয়ার ইতিহাসে নারীর ভূমিকা অল্প, তবে বিশেষজ্ঞরা চীন, জাপান, ভারত, কোরিয়া ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী দেশের নারীদের অবদানের উপর জোর দিয়ে থাকেন।[১৮][১৯]

চীন

বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত কাজে বিপ্লবে নারীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, নারী মুক্তির পথ হিসেবে তাদের কর্মসংস্থান, নারীর উপর শোষণের উৎস হিসেবে কনফুসীয় ও পারিবারিক সংস্কৃতি লিপিবদ্ধ হয়। গ্রাম্য বিবাহ প্রথা, যেমন যৌতুক এখনো আগের মতই থাকলেও এর কিছু পরিবর্তনও এসেছে। যৌথ পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার গড়ে ওঠছে এবং বিবাহ চুক্তিতে নারীর এজেন্সি বাড়ছে।[২০] চীনে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় লিঙ্গ বিষয়ক তত্ত্বের উপর ইংরেজি ও চীনা ভাষার রচনায় প্রচুর নতুন তথ্য পাওয়া যায়।[২১][২২]

জাপান

জাপানী নারীদের ইতিহাস ঐতিহাসিক গবেষণায় উঠে আসে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। ১৯৪৫ সালের পূর্বে নারীর ইতিহাস নিয়ে কোন আলোচনা হয় নি, এমনকি এর পরেও অনেক জাপানী ইতিহাসবেত্তাগণ জাপানী ইতিহাসের অংশ হিসেবে নারীর ইতিহাসকে গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। ১৯৮০ এর দশকের নারীর প্রতি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে আসতে থাকে, জাপানী নারীর ইতিহাস লেখনের সুযোগ দেওয়া হয় এবং নারীর ইতিহাসকে একাডেমিক পাঠ্যক্রম হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ১৯৮০ এর দশকে নারীর ইতিহাসের উপর বেশ কিছু রোমাঞ্চকর ও নতুন গবেষণা করা হয়। এই গবেষণার বেশির ভাগই করেন একাডেমিক নারী ইতিহাসবেত্তাগণ। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী লেখক, সাংবাদিক, ও আনাড়ি ইতিহাসবেত্তাগণও এই ধরনের গবেষণা করেন। জাপানী নারীদের ইতিহাস শিক্ষা বর্তমানে প্রচলিত বিষয়সমূহের অংশ হিসেবে গৃহীত হয়েছে।[২৩]

Other Languages